ঢাকা, শুক্রবার ই-পেপার সংস্করণ

সংবাদ বার্তা

সত্য প্রকাশে নির্ভীক — প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পুঁজিবাজারে নতুন যুগের সূচনা, ২০২৮ সালে আসছে ডেরিভেটিভস মার্কেট

বাণিজ্য · 2026-09-06 15:03:35

২০২৬ সালের মধ্যে ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর সিদ্ধান্ত বিএসইসির

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর সময়সীমা চূড়ান্ত করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ডিএসইর দাখিল করা বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা অনুমোদনের মাধ্যমে এ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে কমিশন সভায় পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালার খসড়া অনুমোদন, ‘জেড ক্যাটাগরি’র শেয়ার হস্তান্তরে শর্ত শিথিল এবং বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বিতরণে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব সিদ্ধান্তের ফলে পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি বাজারে গতিশীলতা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হওয়ার পথ আরও সুগম হবে।

ইনডেক্স ফিউচারে হেজিংয়ের সুযোগ

আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, ইনডেক্স ফিউচার চালু হলে বিনিয়োগকারীরা পুরো ইনডেক্সের উত্থান-পতনের ওপর ভিত্তি করে হেজিং করার সুযোগ পাবেন।

বিশেষ করে বাজার নিম্নমুখী হলে পোর্টফোলিওর ঝুঁকি কমাতে এটি একটি কার্যকর ‘সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে আধুনিক বিনিয়োগ সরঞ্জাম যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া অনুমোদন

বিএসইসির কমিশন সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২৬)’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধিমালার আওতায় যোগ্য কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন মোট শেয়ারের ১০ থেকে ২০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করার শর্ত রাখা হয়েছে।

নতুন বিধিমালার আওতায় যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পেতে পারে—

  • সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি;

  • পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ১০ শতাংশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান;

  • বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি;

  • বিটিআরসি অনুমোদিত এবং কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের টেলিকম, আইসিটি, অবকাঠামো সেবা বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান;

  • কমপক্ষে তিন বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি;

  • কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদের অধিকারী কোম্পানি;

  • কমিশনে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি।

বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ পাঠাতে সময়সীমা

বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রেরণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে কমিশন।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ডাবল ট্যাক্সেশন অ্যাভয়ডেন্স (ডিটিএ) সার্টিফিকেট পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের মধ্যেই ঘোষিত লভ্যাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে পাঠাতে হবে।

লভ্যাংশ পাঠানোর পর ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কমিশনের মতে, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনে বিলম্ব সংক্রান্ত অভিযোগ নিরসনে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

জেড-ক্যাটাগরির শেয়ার হস্তান্তরে শর্ত শিথিল

‘জেড-ক্যাটাগরি’ভুক্ত কোম্পানির স্পন্সর বা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে।

দুটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কমিশনের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

১. ঋণখেলাপির কারণে শেয়ার বাজেয়াপ্ত হওয়া।

২. মূল শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অনুকূলে শেয়ার ট্রান্সমিশন।

এখন থেকে এসব ক্ষেত্রে কমিশনের আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে না। স্টক এক্সচেঞ্জগুলো তাদের লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী সরাসরি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।

পুঁজিবাজারে নতুন সম্ভাবনা

বিএসইসির সাম্প্রতিক এসব সিদ্ধান্তকে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেরিভেটিভস মার্কেট চালু, সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনে সময়সীমা নির্ধারণ এবং জেড-ক্যাটাগরির শেয়ার হস্তান্তরে বিধিনিষেধ শিথিল—সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।