ঢাকা, শুক্রবার ই-পেপার সংস্করণ

সংবাদ বার্তা

সত্য প্রকাশে নির্ভীক — প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জ্বালানি সংকটে বর্তমান সরকারের কোনো দায় নেই: তিতুমীর

জাতীয় · 2026-09-06 14:09:37

জ্বালানি সংকট সমাধানে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রস্তাব

জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে জরুরি ভিত্তিতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

বুধবার রাজধানীর পল্টন টাওয়ারের ইআরএফ মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জসমূহ: আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এ সেমিনারে সহ-আয়োজক ছিল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ভুল নীতির সমালোচনা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভুল নীতির কারণে বিগত সরকার দেশের ওপর কী পরিমাণ ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে, তা তরুণ প্রজন্মের জানা উচিত।

এ জন্য ‘কস্ট অব ইন্যাকশন’ বা ‘কস্ট অব রং ডুইং’ শীর্ষক গবেষণা করার আহ্বান জানান তিনি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সমিতিগুলোকে এ বিষয়ে সমীক্ষা করার আহ্বান জানান উপদেষ্টা।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল করার বিষয়েও আশ্বস্ত করেন তিনি।

রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ

নতুন বেতনকাঠামোর অর্থায়ন কীভাবে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রাজস্ব আদায়ের হিসাব নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে বসা হবে।

তিনি জানান, আয়কর ও ভ্যাট বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কর ফাঁকি রোধেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

‘লুণ্ঠনের অর্থনীতি থেকে উৎপাদনের অর্থনীতিতে ফিরতে হবে’

সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, লুণ্ঠনের অর্থনীতি থেকে উন্নয়ন ও উৎপাদনের অর্থনীতিতে ফিরে আসতে হবে। এ জন্য কৃষি, শিল্প ও অনানুষ্ঠানিক শিল্পখাতের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অর্থনীতিতে স্বস্তি ও অস্বস্তি—দুই-ই আছে

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ছয় মাসের পরিস্থিতি বিবেচনা করে অর্থনীতির একতরফা উন্নতি বা অবনতি বলা যায় না।

তার মতে, রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির মতো কিছু সূচকে স্বস্তি থাকলেও উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জ্বালানির মতো কিছু সূচকে অস্বস্তি রয়েছে।

তিনি অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে গভীর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন। কর ব্যবস্থায় ছাড় দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ব্যাংক খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য নির্ণয়ের জন্য যথাযথ অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (AQR) করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ফাহমিদা খাতুন।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার তাগিদ

জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই চিরাচরিত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। স্বল্পমেয়াদে সংকট সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কী হবে, সে পরিকল্পনাও এখন থেকেই করা প্রয়োজন।

‘বাংলাদেশে অর্থনীতির ফর্মুলা তেমন কাজ করে না’

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করলেও তা স্বীকার করবেন না—এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রচলিত অনেক ফর্মুলা তেমন কাজ করে না; এর বাইরে আরও কিছু বিষয় প্রভাব ফেলে।

তিনি চাঁদাবাজি ও জ্বালানি সংকটকে অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রস্তাব

ফজলুল হক বলেন, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা জ্বালানি। শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে দ্রুত এর সমাধান করতে হবে।

তিনি জানান, সরকারকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র চালু করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

এতে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ—দুই সমস্যারই কিছুটা সমাধান হতে পারে বলে মত দেন এফবিসিসিআই প্রশাসক।

‘আইসিইউতে থাকা শিল্পকে আগে বাঁচাতে হবে’

বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ফজলুল হক বলেন, যেসব কারখানা বর্তমানে সংকটে রয়েছে, সেগুলোকে আগে টিকিয়ে রাখতে হবে। যেগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো পরে দেখা গেলেও চলবে।

তিনি বলেন, ‘যে আইসিইউতে আছে, তাকে চিকিৎসা করতে হবে আগে। যে মারা গেছে, তাকে চিকিৎসা দিয়ে লাভ নেই।’

জ্বালানি সংকটের মধ্যেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রপ্তানি ধরে রাখতে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। ডিজেল, জেনারেটর ব্যবহার এবং ওভারটাইমের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে নিতে হয়েছে তাদের।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।