আন্দোলনে দণ্ডপ্রাপ্ত এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ
এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ, বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেওয়া লঘুদণ্ড বাতিল করে তাদের বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আপিল মঞ্জুরের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেতন অবনমিতকরণের দণ্ড বাতিলের আদেশ দেওয়া হয়।
শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে উপকমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা, কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার ও উপকর কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
যেসব কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ
শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন—
১. উপকমিশনার মো. শাহাদাত জামিল
২. রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বাশার
৩. রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া
৪. উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল আলম
৫. কমিশনার জাকির হোসেন
৬. যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির
৭. অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু
৮. অতিরিক্ত কমিশনার আ আ ম আমীমুল ইহসান
৯. অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়ম
১০. অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহাম্মদ তারেক রিকবদার
১১. উপকর কমিশনার নো. জিল্লুর রহমান
১২. উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল
১৩. অতিরিক্ত কর কমিশনার মির্জা আশিক রানা
১৪. যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা
১৫. যুগ্ম কর কমিশনার মামুন মিয়া
১৬. অতিরিক্ত কর কমিশনার মিজ চাঁদ সুলতানা
১৭. অতিরিক্ত কর কমিশনার সুলতানা হাবীব
১৮. অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ
১৯. যুগ্ম কর কমিশনার মিজ মাসুমা খাতুন
২০. যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন।
বদলি আদেশ ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ
প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৪ জুন সকাল সাড়ে ১১টায় এসব কর্মকর্তা রাজস্ব ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান করেন। সেখানে তারা ওই বছরের ২২ জুন জারি করা বদলির আদেশ আইনসংগত কারণ ছাড়া অবজ্ঞাপূর্বক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেন।
এ ঘটনাকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং বদলি আদেশ অমান্যকারীকে সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, এ ধরনের আচরণ চাকরির শৃঙ্খলার জন্য হানিকর, শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং সরকারি আদেশ অবজ্ঞার শামিল।
বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিভাগীয় মামলায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও বেতন কয়েক ধাপ এবং কারও বেতন কয়েক বছরের জন্য অবনমিত করা হয়েছিল।
এ ধরনের আচরণকে ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ৩০৩ বিধির লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর পর্যায়ভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দণ্ডাদেশ মার্জনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপতি তাদের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মূল বেতনে অবনমিতকরণের লঘুদণ্ড বাতিল করে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় মামলার দায় থেকে কর্মকর্তাদের অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালে এনবিআরকে দুই ভাগ করে ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ ও ‘রাজস্ব নীতি’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করার বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে কলমবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে এবং সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামোতেই এনবিআরের কার্যক্রম চলবে।
এর মধ্যে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একপর্যায়ে তাকে সংস্থার কার্যালয়ে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়।
‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ স্থবির হয়ে পড়ে কার্যক্রম
দাবি আদায়ে ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
পরদিনও কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে তৎকালীন সরকার এনবিআরের সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে।
এরপর নতুন সরকার গঠনের আগেই একের পর এক এনবিআর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত আসতে থাকে। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়, আবার কারও বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এবার ২০ কর্মকর্তার সেই লঘুদণ্ড বাতিল করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে।